অপলাপ ০২: মানুষ

কাকে মানুষ বলা যায় সে বড় কঠিন প্রশ্ন। এর সাথে বৈজ্ঞানিক সত্য জড়িত। বস্তুতঃ বৈজ্ঞানিক সত্যই একমাত্র বিচারের দাবিদার। বিচারটাও সহজ। আমরা মানুষ বলি হোমো স্যাপিয়েন্স বলে বিশেষ প্রজাতির একটি জীবকে। আমি এটাই মানি।

তবে, কাউকে যখন অমানুষ বলা হয় বোধকরি সে যে জাতে মানুষ এবং তেমন আচরণই তার কাছে কাম্য এমন একটা ধারণা থেকেই বলা হয়। তাই মানুষ হলেই যে মানুষ হয় না এমন একটা ব্যাপার আছে বোধহয় সামাজিক জীবনে।

আমার সামাজিক জীবন বেশ অগোছালো। কিছু মানুষ স্নেহ করেন, বহুতর মানুষ আমায় করেন ঘৃণা, অন্ততঃ বিতৃষ্ণা অনুভব করেন। খুব কম মানুষ মেশেন আমার সাথে। কেউ যে আমায় অমানুষের দলে রাখেন না এমনটা ভাবা অযৌক্তিক। আমি অসামাজিক জীব। মানুষ নিয়ে আমার একরকম মনগড়া ভাবনা আছে।

মানুষের একটা বেশ উদাররকমের স্কেচ আছে আমার কাছে। উদাররকমের বলতে তা এতই সাধারণ, তাতে রেখা এত কম যে তা ছেলে বা মেয়ে বা অন্যকিছু, তার বয়স, ধর্ম, বিত্ত কিছুই তাতে বোঝা যায় না। এ হচ্ছে মানুষের হাজার বছরের সভ্যতায় যতটুকু পাওয়া তাই দিয়ে আঁকা। এতে ব্যক্তি মানুষের নানাবিধ বাহুল্য বা সমাজের ক্রুরতার মেদ অনুপস্থিত। কোনোক্রমে তাবৎ মানুষের এক অখণ্ডতা নিয়ে সেই মানুষটা সামনে দাঁড়ায়। তার কোনোকিছু হতে বাধা নেই। আমি যখন মানুষ দেখি, এই মানুষটাকেই দেখি।

কিন্তু, মানুষের স্বাতন্ত্র্যগুলোরও স্বার্থকতা আছে তার চরিত্রে। সে প্রয়োজনীয়তা অবহেলার নয়। একজন সদ্য স্কেচড্ হওয়া মানুষ যখন তার সামনে দিয়ে যাওয়া একটি মেয়েকে উত্যক্ত করে আমার স্কেচে একটা শিশ্ন আঁকা হয়। সেই আপাদমস্তক উলঙ্গ অশ্লীলতায় আমার বিবমিষা। এমনি করে মানুষের বহুবিধ নীচতায় আমি অবাক হয়েছি। মানুষের ঘৃণা, বিদ্বেষ, বর্ণবাদ কখনো তাদের মাংসাশী প্রাণীর মত হিংস্র অভিব্যক্তি দিয়েছে। আমি উল্টোটাও দেখেছি। হতাশার সাথে, খুব কম সংখ্যক হলেও আমি দেখেছি কিছু মানুষের স্কেচটা একধরণের লাবণ্য পায়, কারো বা দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা ঋজু।

কখনো কখনো আমি রেখা টানি স্কেচে, নিজের ইচ্ছেমত। তার সবটা হয়ত যার ব্যক্তিত্ব আঁকছি তার সাথে মেলে না তবে মেলানোর চেষ্টায় আমার সততা আছে। একেকদিন মানুষ দেখতে বের হই পথে। চোখের সামনে স্কেচের পর স্কেচ ঘুরে ফিরে বেড়ায়, ক্রমে একেকজন ব্যক্তি হয়ে ওঠে। খুব আগ্রহের সাথে দেখি। এত দেখার হয়ত কিছুই নেই, রোজই তারা একইভাবে কাটায়, তবু দেখি।

জানি, পৃথিবীতে এত যুদ্ধ, ধ্বংস কোনোকিছুই মানুষের ভালোমানুষির পক্ষে যুক্তি দেয় না। আমি আস্থা হারাই। জানি। তবু মনে হয়, মানুষ একদিন মানুষকে সহজ করে দেখতে শিখবে। তার গায়ের রঙ, ধর্ম, জাতীয়তা সবকিছুর পরেও যে সে মানুষ এই বোধটা মানুষের আসবে একদিন। মূলত, ক্রমাগত মানুষের হীনতায় আমি যতই হতাশ হই নিজেকে এগুলো বলেই প্রবোধ দেই।

একটা বেশ ছেলেমানুষি ইচ্ছে আছে। মানুষের ওই উদাররকমের স্কেচে একদিন আরো কিছু রেখা যোগ হবে। মানুষকে তখন আরো বেশি করে মানুষ হিসেবে দেখতে পাবো। প্রতিটা মানুষ এই মহাবিশ্বে তার অতিক্ষুদ্র কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ জীবনটা খুঁজে নিচ্ছে আর প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাছে আরো বেশি মানবিক হচ্ছে এমন একটা সময়, অন্ততঃ কিছুক্ষণের জন্য হলেও দেখার একটা ইচ্ছে আমি লালন করি। মানুষের কাজে, সভ্যতায় একদিন জিবরানের বৃহৎ মানুষের দেখা পাবো। যার ভেতরে প্রত্যেক মানুষ তার নিজের চেয়েও বড়:

…It was the boundless in you; The vast man in whom you are all but cells and sinews; He in whose chant all your singing is but a soundless throbbing. It is in the vast man that you are vast… — Kahlil Gibran (The Prophet)

‘অপলাপ’ সংকলনের লেখামাত্রই অপলাপ নয়। জ্ঞানত অপলাপে আমার রুচি নেই। শুধু এই কথাটাই বলতে চাই যে আমার সত্য স্বাভাবিকভাবেই আমার দেখার রঙে রাঙানো। তা আমার কাছে যৌক্তিক। সে সত্য সার্বজনীন সত্যের মাপকাঠিতে মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে। এ তো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়, এ হলো আমার স্মৃতি যা সবসময়ই দুর্বল। সে দুর্বলতার ফাঁকগুলো আবেগের রঙ দিয়ে নিজের অজ্ঞাতেই পূরণ করতে পারি।